
নয়াদিল্লি, মার্চ ২৪: ২৫ মার্চ ১৯৩১ তারিখে কানপুরের রাস্তায় একটি দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, যা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল। গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত নিরপরাধ মানুষদের বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। মাত্র ৪০ বছর বয়সে তিনি প্রমাণ করেন যে একজন সত্যিকারের সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী কেবল কলম দিয়ে নয়, বরং নিজের বুক সামনে রেখে দেশকে সেবা করে।
গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর শাহাদতের দিনটি দেশে আত্মত্যাগ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনে আমরা সেই মহান আত্মাকে স্মরণ করি, যিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং মানবতার রক্ষায় নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন।
গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর জন্ম ২৬ অক্টোবর ১৮৯০ সালে প্রয়াগরাজের (অলাহাবাদ) অত্রসুইয়া মহল্লায়। তাঁর পিতা শিব নারায়ণ শুক্ল একজন সাধারণ শিক্ষক ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা মুঙ্গাওয়ালি (মধ্যপ্রদেশ) সম্পন্ন করার পর তিনি কানপুরে আসেন এবং সেখান থেকেই সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। ১৯১৩ সালে তিনি ‘প্রতাপ’ সাপ্তাহিকের সম্পাদনা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে দৈনিক হয়ে ওঠে। ‘প্রতাপ’ ব্রিটিশ বিরোধী লেখার জন্য পরিচিতি লাভ করে। বিদ্যার্থী তাঁর কলম দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কঠোর সমালোচনা করেন এবং স্বদেশী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ও সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তিনি কেবল সাংবাদিকই ছিলেন না, বরং একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ এবং সমাজসেবীও ছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে তিনি বহুবার কারাগারে গিয়েছিলেন। ১৯২০-এর দশকে তিনি উত্তরপ্রদেশ প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল নির্ভীক, নিরপেক্ষ এবং জনহিতৈষী। তিনি গরিব কৃষক, শ্রমিক এবং দলিতদের আওয়াজকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেন। ‘প্রতাপ’ এর মাধ্যমে তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লেখালেখি করেন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দেন।
২৫ মার্চ ১৯৩১ তারিখে ঘটনাটি ঘটে। ভগৎ সিং, রাজগুরু এবং সুখদেবের ফাঁসির দুই দিন পর কানপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। পুরো শহর সহিংসতার আগুনে জ্বলছিল। দাঙ্গার খবর শুনে গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী কোন অস্ত্র ছাড়াই মাঠে নেমে পড়েন। তিনি উভয় সম্প্রদায়ের নিরপরাধ মানুষদের বাঁচানোর অভিযান শুরু করেন। এক স্থানে হিন্দু জনতা মুসলিমদের উপর হামলা চালালে, তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে মুসলিমদের রক্ষা করেন।
অন্য স্থানে মুসলিম জনতা হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছিল, তখন তিনি সেখানে গিয়ে হিন্দুদের রক্ষা করেন। তিনি বারবার জনতাকে সহিংসতা না করার আহ্বান জানান, কিন্তু ক্রুদ্ধ জনতা তাঁর কথা শোনেনি। শেষ পর্যন্ত, ২৫ মার্চ ১৯৩১ তারিখে দাঙ্গাকারীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে তাঁর মৃতদেহ কয়েক দিন পর অজ্ঞাত মৃতদেহের স্তূপে পাওয়া যায়। মৃতদেহের অবস্থা দেখে বোঝা যায় যে অমানবিক নিষ্ঠুরতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করা হয়েছে।
দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁকে ‘দেশের গৌরব’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর শাহাদত প্রমাণ করে যে একজন সত্যিকারের দেশসেবক সাম্প্রদায়িকতার সামনে কখনো মাথা নত করে না, বরং তা প্রতিরোধ করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করে।
আজ যখন দেশ আবারও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে, তখন গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আসল দেশপ্রেম কলম এবং করুণার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় যে ধর্মের নামে সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
–
এসসিএইচ/ডিকেপি











Leave a Reply