Bengal Daily Kiran

Latest Bengal News – Breaking News Today, Live News, World

ফিরাক গোরখপুরী: শায়রিতে প্রেম, দুঃখ ও দর্শনের প্রতিফলন

ফিরাক গোরখপুরী: শায়রিতে প্রেম, দুঃখ ও দর্শনের প্রতিফলন

নতুন দিল্লি, মার্চ ৩: মুখফট মেজাজ ও শায়রির জন্য পরিচিত রঘুপতি সহায়, যিনি ফিরাক গোরখপুরী নামে পরিচিত, উর্দু সাহিত্যের একজন মহান শায়র ছিলেন। তার শায়রিতে প্রেম ও দুঃখের পাশাপাশি জীবন দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি সিভিল সার্ভিস ত্যাগ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন এবং উর্দু শায়রিকে নতুন দিশা দেন। আজও তার শায়রি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়গ্রাহী।

ফিরাক গোরখপুরী ১৮৯৬ সালের ২৮ আগস্ট গোরখপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮২ সালের ৩ মার্চ দিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবন ও শায়রির যাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

তিনি ১৯১৮-১৯১৯ সাল থেকে শায়রির যাত্রা শুরু করেন। ১৯১৮ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে তার প্রথম পর্যায় ছিল। এই সময়ে তিনি ১০০টিরও বেশি গজল, ৬০-৭০টি রুবাই ও অনেক নজম রচনা করেন। উর্দু শায়রিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারের সময় ছিল এটি, যেখানে সত্য, অনুভূতি, প্রেম, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও প্রকৃতির চিত্রায়ণের সন্ধান ছিল। তার শায়রিতে ধীরে ধীরে নতুন দুঃখ ও কষ্টের প্রকাশ ঘটতে থাকে, যা তার স্বর হয়ে ওঠে।

ফিরাক গোরখপুরী শুধু শায়রিতেই নয়, বরং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘সবিনয় অবজ্ঞা আন্দোলনে’ অংশগ্রহণ করেন। ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাজনৈতিক বন্দী করে জেলে পাঠায়। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের সিভিল সার্ভিসের চাকরি ত্যাগ করেন। জওহরলাল নেহেরুর আহ্বানে তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সহকারী সচিবের পদেও কাজ করেছেন।

১৫ মাস তিনি আগ্রা জেলে রাজনৈতিক বন্দী ছিলেন। জেলে থাকা অবস্থায় অনেক মুশায়রা অনুষ্ঠিত হয়। এক মুশায়রায় তিনি একটি শের পড়েন: “আহল-এ-জিন্দার এই মাহফিল প্রমাণ করে, যে বিখরিত হয়ে ও রাজা উদ্বিগ্ন হয়নি।”

ফিরাকের জীবনে শায়রি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও শিক্ষা তিনটির সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। তিনি একদিকে গভীর অনুভূতির শায়রি রচনা করতেন, অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামও করেছেন। তার বহুমুখী ব্যক্তিত্ব আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

১৯১৮ সালে তিনি এমন একজনের প্রেমে পড়েন, যার সঙ্গে দেখা হওয়ার আশা ছিল না। এই প্রেম তাকে ১২-১৩ বছর ধরে অস্থির রাখে। তিনি বলেন, তিনি প্রেমকে কখনোই অশ্লীলতা হিসেবে গ্রহণ করেননি। শারীরিক আকর্ষণকে স্বীকার করলেও, তিনি অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে শক্তিশালী করেছেন। তার প্রেমের শেরগুলোতে একাকিত্ব, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদের গভীর অনুভূতি রয়েছে।

তিনি জানান, “আমি আমার প্রেমের শেরগুলোকে অশ্লীলতার শিকার হতে দেইনি। আমি প্রেম ও শারীরিক সম্পর্কের প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু আমি এই সত্যেরও প্রতি আকৃষ্ট যে, অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে দুর্বল না করে শক্তিশালী করা সম্ভব।”

পারিবারিক দুঃখও তার শায়রিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯১৮ সালে তার বাবা মুন্সী গোরখ প্রসাদ ইবরতের দেহরাদুনে মৃত্যু হয়। জেলে থাকার সময় তার ছোট ভাই মারা যান। বড় ভাইও যুবক অবস্থায় মারা যান। এই দুঃখগুলো তিনি মারমার শের ও নজমে প্রকাশ করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর লেখা নজমে সকালে সৌন্দর্য ও দুঃখের মেলবন্ধন রয়েছে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর লেখা দীর্ঘ নজমে দুঃখের গভীরতা স্পষ্ট।

ভগবদ গীতা থেকে প্রভাবিত হয়ে গোরখপুরী “নগম-এ-হাকিকত” নামের একটি নজম রচনা করেন। এতে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে উপদেশ দেন, তা তিনি উর্দুতে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন। নজমের কিছু পঙক্তিতে তিনি বলেন, “সার্বজনীন সৃষ্টি, নেকি-বদী, দুঃখ-সুখ সব তার নূরের কিরণ। তিনি নিজেই পাণ্ডবদের ধৈর্য, যুদ্ধ-এ-বদরের শহীদদের সাহস, রামের সোহাগ, কারবালার নিদ্রা। পুরো অস্তিত্ব তার কারণেই স্থায়ী।”

১৯২৪ সালে তিনি আলিগড়ে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সচিব ছিলেন। এক রাতে একাকীত্বে তাকে দেশপ্রেমে ভরা একটি গজল লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। ইংরেজি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণের আবেগ তার অনেক গজলে প্রতিফলিত হয়েছে।

ফিরাক গোরখপুরী তার অসাধারণ সাহিত্যিক অবদানের জন্য অনেক বড় ও সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৯৬০ সালে তাকে উর্দু সাহিত্যের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়। ভারত সরকার তাকে পদ্ম ভূষণে সম্মানিত করে। বই ‘গুল-এ-নগমার’ জন্য তাকে দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্যিক সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি আরও অনেক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।

এমটি/ডিএসসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *